
টানে সেকি মজা—ময়মনসিংহ অঞ্চলের এই ছয় জেলার মানুষের চিরচেনা শ্যামল রূপের ভিড়ে রাশিদার জন্ম যেন ছিল এক প্রকৃতির খেয়াল। যেখানে তিব্বত সাবান আর ভারতীয় ক্রিম মেখেও গায়ের রঙ উজ্জ্বল করা দায়, সেখানে ঈমান ব্যাপারীর ঘরে জন্ম নিল এক ‘চাঁদ বদনী’ কন্যা। কিন্তু এই রূপই কি রাশিদার জন্য আশীর্বাদ হয়ে এলো, নাকি অভিশাপ?
অতিপ্রাকৃতের তকমা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
আমাদের গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সহজাত প্রবণতা হলো, যেকোনো অস্বাভাবিকতাকেই তারা অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত হিসেবে ধরে নেয়। রাশিদার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তার দুধে-আলতা গায়ের রঙ আর মেঘবরণ কোঁকড়ানো চুল তাকে সাধারণ শিশুদের কাতার থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। শৈশবেই তাকে তকমা দেওয়া হলো ‘জ্বিন-পরী’র। এমনকি গাছের বাম্পার ফলনকেও যুক্ত করা হলো তার অলৌকিক ক্ষমতার সাথে।
ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো:
* বিচ্ছিন্নতা: সমবয়সীরা তাকে সমীহ করে এড়িয়ে চলল। এক্কাদোক্কা বা পুতুল খেলায় তার কোনো জায়গা হলো না।
* অহমিকা ও একাকীত্ব: নিজেকে ‘বিশেষ কেউ’ ভেবে রাশিদা নিজেও একা থাকতে শুরু করল। বনবাদাড়ে একা ঘুরে বেড়ানো আর নিজের সাথে কথা বলা তার স্বভাবে পরিণত হলো।
* বৈষম্য: ভাইবোনদের বঞ্চিত করে রাশিদার একাধিপত্য তার শৈশবকে অহংকারী করে তুললেও মানসিকভাবে তাকে একা করে দিয়েছিল।
ত্রিশালের সেই কালরাত: অলৌকিক নাকি আতঙ্ক?
নয় বছর বয়সেই রাশিদার জীবনের মোড় ঘুরে যায় ত্রিশালের সেই ঝুম বৃষ্টির রাতে। নিখোঁজ হওয়ার তিনদিন পর বাঁশঝাড়ে তাকে যে অবস্থায় পাওয়া গেল, তা কোনো সাধারণ শিশুর জন্য এক ভয়াবহ ট্রমা হওয়ার কথা। অথচ সমাজ সেটাকে দেখল তার ‘অলৌকিক ক্ষমতার’ প্রমাণ হিসেবে।
অদূরে পড়ে থাকা সেই অচেনা পুরুষের নিথর দেহ আর তার গলায় গভীর ক্ষত—ঘটনাটি যতটুকু না অলৌকিক, তার চেয়ে বেশি অপরাধমূলক বা রহস্যময় হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। পুলিশের খাতায় তা ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে নথিভুক্ত হলেও লোকমুখে রাশিদা হয়ে উঠল এক ভীতি মেশানো বিস্ময়।
রাশিদার রাশিফল: ক্ষমতার দণ্ড না কি নিয়তির পরিহাস?
নয় বছর বয়সের এক শিশুর কাঁধে যখন একটি খুনের রহস্য বা অলৌকিকত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা চিরতরে থমকে যায়। রাশিদার রাশিফল সেদিনই বদলে গিয়েছিল। তার গালের লালচে আভা আর শারীরিক পরিবর্তনের সাথে সাথে তার চারপাশের রহস্যের দেয়াল আরও ঘনীভূত হলো।
আজ রাশিদা কেবল একটি নাম নয়, বরং আমাদের সমাজের সেই অন্ধবিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল—যেখানে বিজ্ঞানের চেয়ে গুজব বেশি শক্তিশালী, আর শৈশব বিসর্জন দেওয়া হয় অলৌকিকত্বের বেদীতে।