
সিলেটের রাজপথে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দৈনিক জালালাবাদ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার আবু তাহের মো. তোরাবকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে। এই চার্জশিটে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাসহ মোট ১৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় বছর পর দাখিলকৃত এই অভিযোগপত্রটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) শাওন মাহমুদ অপু সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই চার্জশিট জমা দেন।
মামলার নথি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে গত ১৯ জুলাই, ২০২৪ তারিখের সেই ভয়াবহ ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের চিত্র। ওইদিন দেশব্যাপী চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে উত্তাল ছিল সিলেটের রাজপথ। পেশাগত দায়িত্ব পালনের তাগিদে সংবাদ সংগ্রহ করতে নির্ভীকভাবে মাঠে নেমেছিলেন সাংবাদিক তোরাব। শরীরে ছিল সাংবাদিকতার পরিচয় বহনকারী জ্যাকেট। কিন্তু সেই পরিচয়পত্র তাকে রক্ষা করতে পারেনি।
চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই হত্যাকাণ্ডটি ছিল সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের “প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও উসকানিতে এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের “সরাসরি সহযোগিতায়” আসামিরা মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিরীহ এই সাংবাদিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে তখন প্রকম্পিত চারপাশ। একপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তোরাবকে খুব কাছ থেকে নির্মমভাবে গুলি করা হয়। বুলেটের আঘাতে শরীর ঝাঁজরা হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় রাজপথে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তার শরীর থেকে ঝরা রক্তে রঞ্জিত হয় সিলেটের মাটি। কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই মুক্ত গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার জন্য এমন বর্বরোচিত ও সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্বিক তদন্ত, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, জব্দকৃত আলামত এবং মামলার বাদীসহ মোট ১৩ জন সাক্ষীর জবানবন্দিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩ (বেআইনি সমাবেশ), ১৪৭(দাঙ্গাহাঙ্গামা), ১৪৮ (মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দাঙ্গা), ৩০২ (হত্যা), ১৪৯ (সাধারণ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অপরাধ) এবং ৩৪ (সাধারণ অভিপ্রায়ে অপরাধমূলক কাজ) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০২ ধারাটি সরাসরি হত্যার অভিযোগ, যা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
এই মামলায় অভিযুক্তদের তালিকায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের নাম থাকায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযুক্ত ১৮ জন আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. সাদেক দস্তগীর কাউছার, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আজবাহার আলী শেখ, সহকারী পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান, বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কল্লোল গোস্বামী, কোতোয়ালি মডেল থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঈন উদ্দিন, ওসি (তদন্ত) ফজলুর রহমান এবং এসআই কাজী রিপন সরকার। পুলিশ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অভিযুক্তদের মধ্যে আরও রয়েছেন সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সিটি কাউন্সিলর আপ্তাব উদ্দিন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি পীযুষ কান্তি দে, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের পিএস সাজলু লস্কর, ছাত্রলীগ নেতা ও কাউন্সিলর রুহেল আহমদ, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সজল দাস অনিক, শিবলু আহমেদ ওরফে মো. রুহুল আমিন, বিশ্বনাথ উপজেলা ছাত্রলীগের সদস্য মো. জাহেদ আহমদ রাজু এবং পুলিশ সদস্য সেলিম মিয়া, আজহার ও উজ্জল।
একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এতজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে একটি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করার ঘটনা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তবে, চার্জশিটভুক্ত ১৮ জন আসামির সকলেই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। অভিযুক্তরা পলাতক থাকায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করতে না পারলে এই বহুল আলোচিত মামলার বিচারকাজ বিলম্বিত হতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।