হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে শিয়া সম্প্রদায়ের এক পরিবারের বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি ও হেফাজতে ইসলামের দুই নেতাসহ তাঁদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে। গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে উপজেলার রামলোহ গ্রামে কানাডাপ্রবাসী মুহিবুর রহমানের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় বাড়িতে থাকা তাঁর মা সুফিয়া বেগম (৬৩) ও বোন ফাতেমা আক্তার (লাকী) প্রতিবেশীদের সহায়তায় প্রাণে রক্ষা পান।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সহসভাপতি মৌলভী আব্দুল ওয়ালী সিদ্দিকী, হেফাজতে ইসলাম মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা শামসুল ইসলামসহ ছয় থেকে সাতজন ওই রাতে বাড়িতে যান। তাঁরা মুহিবুর রহমানকে 'শিয়া কাফের' আখ্যা দিয়ে গালিগালাজ করেন এবং পরিবারের সদস্যদের বাইরে আসতে বলেন। সুফিয়া বেগম ও তাঁর মেয়ে বের না হলে হামলাকারীরা বাড়ির একাংশে আগুন ধরিয়ে দেন। আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে ঘরের ভেতরে থাকা মা-মেয়ে চিৎকার শুরু করেন। তাঁদের চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে দুজনকে উদ্ধার করেন। পরে স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় শিয়া সম্প্রদায়ের এক প্রতিবেশী বলেন, 'শিয়া পরিচয়ের কারণে পরিবারটিকে দীর্ঘদিন ধরে নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ওই রাতে চিৎকার শুনে আমরা ছুটে এসে মা-মেয়েকে উদ্ধার করি। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাবের কারণে এলাকার অনেকেই প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।'
সুফিয়া বেগমের অভিযোগ, তাঁর ছেলের শিয়া ধর্মীয় পরিচয় এবং সুন্নি পরিবারের এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কের জেরে দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এর আগে ১৪ আগস্ট আব্দুল ওয়ালী সিদ্দিকী কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে বাড়িতে এসে মুহিবুরকে দেশে ফিরিয়ে আনা, প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া, শিয়া মতবাদ ত্যাগ এবং ২০ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য এক মাসের সময় বেঁধে দেন। দাবি পূরণ না করলে বাড়িতে আগুন দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
জানা গেছে, মুহিবুর রহমান মৌলভীবাজার শহরে 'মায়ের দোয়া মোটরস অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ' নামে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ধর্মীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জেরে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর বিরোধের সূত্রপাত হয়। পরবর্তী সময়ে হামলা, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতায় ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে কানাডায় যান।
পরিবারের দাবি, মুহিবুর দেশ ছাড়ার পরও তাঁদের ওপর চাপ বন্ধ হয়নি। চলতি বছরের ২০ জুন তাঁর মা ও বোনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে জুলাইয়ে মুহিবুরের বিরুদ্ধে মসজিদে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা করা হয়। তবে ঘটনার সময় তিনি কানাডায় ছিলেন বলে পরিবারের দাবি।
অগ্নিসংযোগের পরদিন বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সুফিয়া বেগম থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলে তাঁর অভিযোগ।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল ওয়ালী সিদ্দিকী ও মাওলানা শামসুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঘটনাটিকে ধর্মীয়ভাবে স্পর্শকাতর উল্লেখ করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।